কৃষি উপকরণের দাম বাড়লেও ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না কৃষক

কয়েক বছর ধরে সার-কীটনাশক, জ্বালানি তেলসহ কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে কৃষিতে। কৃষি উপকরণের দাম বাড়লেও ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না কৃষক।

কয়েক বছর ধরে সার-কীটনাশক, জ্বালানি তেলসহ কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে কৃষিতে। কৃষি উপকরণের দাম বাড়লেও ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না কৃষক। কৃষি উৎপাদন বাড়িয়েও লাভ ঘরে তুলতে পারছেন না তারা। হিমাগারের অভাবে অতিরিক্ত ফসল সংরক্ষণ করতে পারছেন না। ফলে কম দামে মৌসুম চলাকালেই ফসল বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের। দিনশেষে লাভবান হচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগীসহ বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়ী।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে (পিঙ্ক শিট অনুযায়ী), কয়েক বছর সার, কীটনাশক ও যন্ত্রপাতির দাম বেড়েছে বিশ্ববাজারে। গত মে মাসে ডিএপি সারের প্রতি টনের দাম ছিল ৬৬৯ ডলার, জুনে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ৭১৫ ডলার, জুলাইয়ে ৭৩৬ ডলারে পৌঁছায়। ২০২৪ সালের (এপ্রিল-জুন) একই সময়ে এর দাম ছিল ৫৩৭ ডলার। তবে ফসফেট রকের মূল্য গত তিন মাসে বাড়েনি। গত মে থেকে জুলাই পর্যন্ত এটি টনপ্রতি ১৫২ ডলারে বিক্রি হয়। ২০২৪ সালের একই সময়েও দাম একই ছিল। পটাশিয়াম ক্লোরাইড মে মাসে বিক্রি হয় প্রতি টন ৩৬২ ডলারে, জুলাইয়েও একই দাম থাকলেও জুনে ১ ডলার বেড়ে বিক্রি হয় ৩৬৩ ডলারে। ২০২৪ সালের একই সময়ে (এপ্রিল-জুন) এর দাম ছিল ৩০৭ ডলার। টিএসপি সার গত মে মাসে প্রতি টন বিক্রি হয় ৫৪১ দশমিক ৫ ডলারে, জুনে এর দাম ছিল ৬৪১ দশমিক ৩ ও গত জুলাইয়ে বিক্রি হয়েছে ৬৫৫ ডলারে। ২০২৪ সালের একই সময়ে এর দাম ছিল ৪৫০ ডলার। মে মাসে ইউরিয়া সার ৩৯২ ডলারে, জুনে ৪২০ দশমিক ৫ ও জুলাইয়ে ৪৯৬ ডলারে বিক্রি হয়েছে। ২০২৪ সালে (এপ্রিল-জুন) বিক্রি হয়েছে প্রতি টন ৩১৩ দশমিক ৭ ডলারে।

এছাড়া জিংক ২০২৪ সালে (এপ্রিল-জুন) ২ হাজার ৮৩৪ ডলারে বিক্রি হলেও চলতি বছরের মে মাসে কিছুটা কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ৬৪৪ ডলারে। এটি জুনে বিক্রি হয় ২ হাজার ৬৫৫ ডলারে, জুলাইয়ে বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৬৩ ডলারে।

এছাড়া অ্যালুমিনিয়াম গত মে মাসে বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৪৪৯ ডলারে, জুনে ২ হাজার ৫২৬ ও জুলাইয়ে ২ হাজার ৬০৬ ডলারে। এটির দাম ২০২৪-এর এপ্রিল-জুনে ছিল ২ হাজার ৫২৩ ডলার। ২০২৪-এর এপ্রিল-জুনে কপার বিক্রি হয় টনপ্রতি ৯ হাজার ৭৫১ ডলারে। গত মে মাসে তা কমে হয় ৯ হাজার ৫৩৩ ডলার। জুনে বেড়ে ৯ হাজার ৮৩৫ ও জুলাইয়ে ৯ হাজার ৭৭১ ডলারে পৌঁছায়।

উত্তরাধিকার সূত্রে কৃষিকাজে জড়িত রংপুরের কৃষক জমির উদ্দিন। তার ভাষ্যমতে, ‘‌কয়েক বছর ধরে কৃষি যন্ত্রপাতি, সার ও কীটনাশকের দাম বেড়েই চলছে। কৃষক যে খরচে ফসল উৎপাদন করছেন, তার ব্যয় উঠছে না। ধান, আলু আর সবজিতে সবচেয়ে কম দাম পাচ্ছেন কৃষক। ‌আমাদের মূল কৃষি হচ্ছে মৌসুমি ধান আর সবজি। শীতকালে বেশি সবজি উৎপাদন হয়। কিন্তু গ্রামে সেভাবে দাম পাওয়া যায় না। সরকারি কোনো মূল্যতালিকাও থাকে না। এবার বাজারে চালের যে দাম ছিল, সেটা ধান বিক্রির সময় আমরা পাইনি। অধিকাংশ কৃষক ধান বিক্রি করেছেন ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকায়, কিন্তু সরকার নাকি ১ হাজার ৪৫০ টাকায় কিনেছে। আমরা আর দামটা পেলাম না।’

নীলফামারী সদর উপজেলার চড়াইখোলা ইউনিয়নের কৃষক আব্দুর রহিম বসুনিয়া বলেন, ‘সার ও বীজের দাম বাড়লে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কৃষি উৎপাদনে।’

তিনি বলেন, ‘বেসরকারি বীজ কোম্পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে বাজার। তারা বিভিন্ন কৌশলে কৃষকদের তাদের বীজ ব্যবহার করতে বাধ্য করছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, বেসরকারি কোম্পানির বীজের দামের কোনো ঠিক নেই। তারা ইচ্ছামতো প্রতি বছরই বীজের দাম বাড়াচ্ছে। সেখানে সরকারের উচিত বাজার মনিটরিং বাড়ানো। তা না করে যদি আবার সার ও বীজের দাম বাড়ে, কৃষকদের দুর্দশা বাড়বে।’ তিনি মনে করেন, কীটনাশক-জাতীয় ওষুধে ভর্তুকি দেয়া উচিত।

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের চাষী আব্দুল মালেক বলেন, ‘‌আমরা মাথার ঘাম মাটিতে ফেলে ফসল উৎপাদন করি। কিন্তু দাম পাই না। লাভ তুলে নেয় ব্যবসায়ীরা। বোরো মৌসুমে ফসল ভালো হয়েছিল, সবাই ভেবেছিল বাম্পার ফলনে লাভবান হব। কিন্তু ভালো ফসলটা বাজারে বিক্রি করতে হয়েছে কম দামে। কারণ আমাদের থেকে মিল মালিকরা কম দামে কিনে নেয়। তারা সেটা বেশি দামে বিক্রি করছে, যার প্রভাবটা বাজারে গিয়ে পড়েছে। এখন বাজারে শাক-সবজিসহ প্রায় সব পণ্যের দাম চড়া। এর কারণ হচ্ছে অফ সিজনে সবজি উৎপাদন কম। আলুর উৎপাদনটা বেশি হয়েছে। যার কারণে আমরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। আবার পেঁয়াজের দাম বেশি, কারণ সরবরাহ কম। কয়েক বছর ধরে সার-বীজের যে দাম বেড়েছে, সে অনুযায়ী ফসলের দাম বাড়লে লাভবান হতে পারতেন কৃষক।’

কৃষিপণ্য বাজারজাত ও ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি আছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ‌এবার আলু উৎপাদন হয়েছে বেশি, যার কারণে কৃষক যেমন দাম পায়নি, আবার জুলাই-সেপ্টেম্বর মৌসুমে ফসল উৎপাদন কম হওয়ার কারণেও তারা দাম পায় না। এবার পেঁয়াজের দাম বেড়েছে সরবরাহ কম থাকার কারণে। কোনো পণ্য বাজারে আসতে হলে সেটার জন্য প্রয়োজন হয় শ্রমিক ও পরিবহন খরচ। কৃষক সেটা পাবেন না স্বাভাবিকভাবে। তবে উপকরণের দাম বাড়ার পেছনে সরকারি ভর্তুকি কম থাকাও দায়ী। সরকার কৃষককে ফসল উৎপাদনে ১০ শতাংশ ভর্তুকি দিচ্ছে। সেটা যদি ২০ শতাংশ করা যায় তাহলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে এবং দাম পাবেন। এখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগও প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন গত কয়েক মৌসুমে ফেনী, চট্টগ্রাম, সিলেটে বন্যা আর ভারি বৃষ্টিপাতের ফলে অনেক পণ্য নষ্ট হয়ে গেছে, যার কারণে কৃষক উৎপাদন খরচ তুলতে পারেননি।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সার, কীটনাশকের সঙ্গে ‌কৃষি শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবে কৃষক তার ফসলের দাম নিয়ে শঙ্কায় থাকছেন। ধানের দাম কেজিপ্রতি ৩৬ টাকা বেঁধে দিয়েছিল সরকার। কিন্তু কৃষক বিক্রি করতে পেরেছেন ৩০-৩২ টাকায়। এক-দেড় মাস আগে বোরো মৌসুম শেষ হয়েছে। সে সময় কৃষক ৯০০ টাকায় ধান বিক্রি করে দিয়েছেন, কিন্তু সরকার দাম বেঁধে দিয়েছিল ১ হাজার ৪৪০ টাকা। মাঠ থেকে যেটি বিক্রি করে দেয় সেটা। ধানের দাম বাড়ছে ঠিকই। চালকল মালিকরা দাম পেয়েছে কিন্তু কৃষক পাননি। অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। এখন শসা বাজারে ১০০ টাকা, কিন্তু কৃষক পাচ্ছেন ৩০ টাকা। তার উৎপাদন খরচই বিক্রির সমান। টমেটো বিক্রি করছেন তারা ১০-১২ টাকায়। কৃষক কখনো তার ন্যায্যমূল্য পান না। দিনের পর দিন উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। সে অনুপাতে দাম পান না কৃষক। অনেক কৃষক তার নিজের শ্রমের হিসাব করেন না। সেটাসহ হিসাব করলে তার জন্য কৃষিকাজ করাই কঠিন হয়ে যাবে।’

সরকার কী করতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সরকার উৎপাদন খরচ অনুযায়ী মাত্র ১০ শতাংশ প্রফিট দেয়। সেটা অনন্ত ২০ শতাংশ হওয়া উচিত। এখন যেভাবে উৎপাদন খরচ ধরা হয়, সেটাতে কৃষক খুব লাভবান হন না। আলু, পেঁয়াজের দাম কমে গিয়েছিল। সেখানে সরকারের ১০ শতাংশ প্রকিউরমেন্ট করা উচিত ছিল। করলে দাম এত নামত না। সরকারের ব্যবস্থাপনা এখানে ব্যর্থ। এখানে সরকারকে বাজারটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সর্বনিম্ন দাম নির্ধারণ করে দেয়া উচিত। তা না হলে বাজারের অস্থিরতা কমাতে পারবে না। উৎপাদন অবস্থায় কিছু ঋণ দেয়া যেতে পারে, স্টোরেজ করার সুযোগ দেয়া দরকার। নতুন নতুন আবিষ্কার নিয়ে আসা দরকার।’

এদিকে কৃষি উপকরণের দাম কমাতে হলে আমদানিনির্ভরতা বাদ দিয়ে দেশে সার ও কীটনাশক উৎপাদন করা যেতে পারে বলে মনে করেন কৃষি উপকরণ ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। দিনের পর দিন দাম বাড়ছে, যার কারণে শ্রমিক খরচ, পরিবহন ও উপকরণ আমদানিতে ব্যয় বেশি পড়ছে। যার কারণে দাম বাড়ছে। উপকরণের দাম বাড়লে সেটার প্রভাব কৃষকদের ওপর পড়ে। কিন্তু সরকার যদি উপকরণ ক্রয়, বিপণন ও বিতরণে কৃষকের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে পারে তাহলে সমাধান সম্ভব।

ন্যাশনাল এগ্রিকেয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘‌কৃষকের দাম না পাওয়ার পেছনে শুধু কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি একমাত্র কারণ নয়। এটা ঠিক যে কৃষি উপকরণের দাম বাড়ছে। সেটার কারণ আমাদের আমদানিনির্ভরতা। কোনো পণ্য আমদানি করতে ৫ শতাংশ কর দিতে হচ্ছে। আমরা যদি সে পণ্য দেশে উৎপাদন করতে পারি, তাহলে দাম অনেক কমিয়ে আনা যাবে। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বিষয়টি নিয়ে উপদেষ্টার সঙ্গে বসবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘‌কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা দরকার, যার মাধ্যমে উৎপাদন, মূল্যের ওঠানামা, সরবরাহ, বিপণন ও বিতরণে শৃঙ্খলা নিয়ে আসা যাবে।’

আরও